পদ্মফুলের অপরূপ সৌন্দর্য নাড়া দিচ্ছে প্রকৃতি প্রেমিকদের

পড়ন্ত বিকেলে মৃদমন্দ আবহাওয়ায় বিলের পানির ঢেউয়ের তালে তালে মাথা উচু করে আছে সাদা- গোলাপী পাপড়ীর মিশেলে একেকটা পদ্মফুল। বিল জুড়ে পদ্মফুলে এমন অপরূপ সৌন্দর্য নাড়া দিচ্ছে দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রকৃতি প্রেমিকদের। কেউও বিলের পাড়ের গাছ তলায় ছুপটি করে বসে উপভোগ করছেন এই সৌন্দর্য। আবার অনেকেই নৌকায় চড়ে পুরো বিল ঘুরে দেখছেন। দু,চোখের যতটুকু দৃষ্টি যায় পদ্মের সমারোহ মনকে প্রফুল্ল করে তুলে। স্বচ্ছ জলরাশিতে ভেসে থাকা পদ্মফুলে পুরো বিল জুড়ে যেন কানায় কানায় ভরে আছে। 

তাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পিপাষু ও প্রকৃতি প্রেমিকদের কাছে নতুন ঠিকানা ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়া উপজেলার ঘাটুটিয়া ও মিনারকুট পদ্মবিল। প্রায় দুইশ একরের এই পদ্মবিলটি আষাঢ় মাস থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত প্রায় পাঁচমাস পদ্মফুল ফুঁটে থাকে।

সূর্য উকি দেয়ার সাথে সাথে একেকটা পদ্মের কলি ভেদ করে পাপড়ি মেলে নিজের সৌন্দর্যের জানান দেয় প্রকৃতির মাঝে। সেই সৌন্দর্যকে যেন আরো নৈসর্গিক করে তুলে খাবার সংগ্রহের জন্য দল বেঁধে ছুটে আসা শালিক পাখি। তাদের কিচির মিচিরে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো বিল। প্রতিটি পদ্ম পাতার উপরে মুক্তার মত টল মল করতে থাকা পানি প্রকৃতির সৌন্দর্যের যেন অলংকার।

পদ্ম বিলের নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করতে জেলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুল সংখ্যাক দর্শনার্থীরা ভিড় করে। তাদের কেউ কেউ ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ান বিলের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে।

বিল ঘুরতে আসা কলেজ ছাত্র নাসিম ও রাকিবুল বলেন, ঘাটুটিয়া পদ্মবিলের নাম শুনেছি। সরেজমিনে এসে দেখি খুবই মনোমুন্ধকর পরিবেশ। আমরা তিন বন্ধু মিলে ডিঙ্গি নৌকা ভাড়া করে পুরো বিল ঘুরে অনেক আনন্দ উপভোগ করেছি। তবে যাত্রা পথে কর্ণেল বাজার থেকে ঘাটুটিয়া পর্যন্ত সড়কে খানাখন্দ থাকায় এবং সড়কটি সরু হওয়াই যান চলাচলে কিছুটা সমস্যা হয়। সড়কটি সংঙ্কার ও প্রশস্ত করা হলে দর্শনার্থীদের চলাচলের সুবিধা হবে।

কলেজ ছাত্রী শামীমা ইয়াছমিন বলেন, এটা পদ্মবিল।এর চারপাশে গাছপালা রয়েছে। এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে সবাই আসতে পারে। পাশে বিজিবি ক্যাম্প থাকাতে নিরাপত্তা ভাল পাওয়া যাচ্ছে। 

ঢাকা থেকে বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা সাংবাদিক ও লেখক শাহ মুহাম্মদ মুতাসিম বিল্লাহ বলেন, অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এই পদ্মবিলে না আসলে বুঝতে পারতাম না ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আরেকটি রূপের বিষয়। এখানকার মানুষের প্রকৃতি সংরক্ষণের যে তাগিদ তা সত্যিই আকৃষ্ট করে সবাইকে। পর্যটন শিল্পের বিকাশে পদ্মবিল বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। যারা প্রকৃতি প্রেমিক তারা এখানে আসলে যে অপার সৌন্দর্য তা নিমিষেই বুঝতে পারবেন।

তবে অনেকটা আক্ষেপের কণ্ঠে স্থানীয়রা বলেন, বিল সংরক্ষণে স্থানীয়ভাবে যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়। কিন্তু অনেক দর্শনার্থীরা বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে আনন্দের ছলে ফুলগুলো ছিড়ে ফেলে। এতে বিলের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। আমরা তাদের প্রতি আহবান জানাই তারা যেন এই বিলের ফুলগুলো না ছিড়ে।

মিনারকোট গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা আলামিন ভূইয়া বলেন, আমাদের গ্রামের পশ্চিম পাশে পদ্মবিল। কয়েক যুগ ধরে এই বিলে পদ্মফুল ফুঁটছে। এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে দূরদূরান্ত লোকজন প্রতিনিয়ত আসছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শিপন মিয়া বলেন, আগে মানুষ তেমন বেশী আসত না। ৪/৫ বছর যাবত মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। ফুলগুলো যখন গাছে থাকে তখন তার সৌন্দর্যটা বৃদ্ধি পায়।তবে বেশীরভাগ দশনার্থীরাই এই ফুলটিকে ছিড়ে এর সৌন্দর্যকে নষ্ট করে দিচ্ছে। যারা আসবে তা দেখে উপভোগ করবে আমরা তা আশা করি। 

ডিঙ্গি নৌকার মাঝি জয়নাল মিয়া বলেন, বর্ষা মৌসুমে তেমন কোন কাজকর্ম থাকে না। ছোট নৌকা নিয়ে বিলের পাড়ে বসে থাকি। বিভিন্ন লোকজন নৌকায় করে বিল উপভোগ করে। এতে আমাদের প্রতিদিন ৫০০/ থেকে ১০০০ হাজার টাকার রোজগার হয়। ফলে পরিবার পরিজন নিয়ে চলতে পারি।

জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: রইস উদ্দিন বলেন, পদ্ম বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যাতে দর্শনার্থীরা নিরিবিলি এবং নিবিগ্নে উপভোগ করতে পারে তার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। 

জেলা প্রশাসক হায়াত উদ- দৌলা খাঁন বলেন, এ বিলকে জেলার আকর্ষনীয় পর্যটন স্পষ্ট হিসেবে গড়ে তুলতে অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হবে। ব্র্যান্ডিং কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের সবর্ত্র বিলের সৌন্দর্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।

Related posts

Facebook Comments

Default Comments

Leave a Comment