এক গ্রামেই শিশু শ্রেণি থেকে মাস্টার্স

স্টাফ রিপোর্টার:

শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই- এই কথাটিকে মূলমন্ত্র হিসেবেই ধারণ করে নিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইসলামপুর গ্রামের মানুষজন। দুই দশক আগেও কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকা গ্রামটিতে এখন শিশু শ্রেণি থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করতে পারছেন শিক্ষার্থীরা। কিন্ডার গার্টেন থেকে শুরু করে এমপিও ভুক্ত স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ রয়েছে ইসলামপুরে। পাশাপাশি গ্রামে একটি সরকারি পলিটেকটিক ইনস্টিটিউটও রয়েছে। এর ফলে মাধ্যমিকে ঝড়ে পরা মেয়ে শিক্ষার্থীরাও এখন গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করছে। অথচ এই ইসলামপুরের ছেলেমেয়েদের মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ চুকাতে যেতে হতো ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর অথবা হবিগঞ্জ জেলায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইসলামপুর গ্রামের মোট জনসংখ্যা ৬ হাজারের কিছু বেশি। দুই দশক আগে গ্রামটিতে শুধুমাত্র একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। সেই বিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে মাধ্যমিকের পড়াশোনা করতে কয়েক মাইল পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হতো পার্শ্ববর্তী সাতবর্গ গ্রামে। ছেলেরা দূরে গিয়ে পড়াশোনা করতে পারলেও মেয়েদেরকে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে পড়াশোনায় নিরুৎসাহিত করত পরিবার।

আবার মাধ্যমিকের পাঠ শেষে উচ্চ মাধ্যমিক ও অনার্স সম্পন্ন করার জন্য ছেলেদের একমাত্র ভরসা ছিল গ্রাম থেকে ৩০ কিলোমিটর দূরবর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ এবং ৫০ কিলোমিটার দূরের হবিগঞ্জ জেলার বৃন্দাবন কলেজ। তবে এখন আর ইসলামপুর গ্রামের ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষার জন্য গ্রামের বাইরে যেতে হচ্ছেনা। উল্টো বাইরের এলাকা থেকে ইসলামপুরে অনেক শিক্ষার্থী আসছে উচ্চ শিক্ষা নিতে।

১৯৮৬ সালে বুধন্তি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা প্রয়াত কাজী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মাধ্যমিক স্কুল করে দেন। এরপর ধীরে ধীরে শিক্ষার বিস্তার ঘটতে থাকে ইসলামপুর গ্রামে। ইসলামপুর বাজারের পাশে অবস্থিত কাজী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম স্কুলটি এমপিও ভুক্ত হয়েছে অনেক আগেই। স্কুলটিতে এখন কলেজ শাখাও চালু হয়েছে।
বর্তমানে ইসলামপুরে দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চারটি কিন্ডার গার্টেন, একটি এমপিও ভুক্ত স্কুল অ্যান্ড কলেজ, একটি এমপিও ভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এবং একটি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষা নিয়ে জীবন গড়ছে।

ইসলামপুর গ্রামের পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পার্শ্ববর্তী কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী ও হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষার্থীরা ইসলামপুর গ্রামে অবস্থিত কাজী মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও ব্রাহ্মণাবড়িয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করছে। শফিকুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ছয়টি বিষয়ে অনার্স ও তিনটি বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করতে পারছেন শিক্ষার্থীরা। এছাড়া পলিটেকটিক ইনস্টিটিউট থেকে চারটি বিষয়ে ডিপ্লোমা করার সুযোগ পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
কাজী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী লুবনা আক্তার জানায়, গ্রামে কোনো স্কুল-কলেজ না থাকায় তাঁর বড়বোন পড়াশোনায় বেশিদূর এগুতো পারেনি। অন্য এলাকার স্কুলে গিয়ে পড়তে হতো বলে বাবা-মা সবসময় চিন্তায় থাকতো। কিন্তু এখন আর লুবনাকে নিয়ে তাঁর বাবা-মাকে কোনো চিন্তা করতে হয়না। কারণ গ্রামেই স্কুল-কলেজ সব রয়েছে। এর ফলে গ্রামের অনেক মেয়েরা পড়াশোনা করতে পারছে বলে জানায় লুবনা।

কাজী মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ফাহমিদা রহমান শশী বলেন, ‘ইসলামপুর গ্রামে এখন সর্বোচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে শিক্ষার্থীরা। গ্রামের কাউকেই বাইরে যেতে হচ্ছেনা। এর ফলে মেয়েদের বেশি সুবিধা হয়েছে। আগে নিরাপত্তার কারণে মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেতো। ছেলেরা পড়াশোনায় এগিয়ে থাকত, এখন গ্রামের মেয়েরাও সর্বোচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে’।
শিমুল মিয়া নামে আরেক শিক্ষার্থী জানান, উচ্চ শিক্ষার জন্য এখন আর গ্রামের বাইরে যেতে হচ্ছেনা তাদের। এতে করে পড়াশোনার খরচও অনেক কমে গেছে। মেয়েরাও পড়াশোনার সুযোগ পেয়ে ছেলেদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

গ্রামের মধ্যে স্কুল-কলেজ পেয়ে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকরাও নিশ্চিন্ত হয়েছেন। বিশেষ করে মেয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবকদের ভয় কেটে গেছে। গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে ভবিষ্যৎ গড়ছে শিক্ষার্থীরা।

ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা জিয়াদুল হক জানান, সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। ইসলামপুরের মানুষ এখন সেটি উপলব্ধি করে ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করছে। আগে পুরো বিজয়নগর উপজেলায় কোনো কলেজ ছিলনা। হবিগঞ্জের বৃন্দাবন কলেজ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজই একমাত্র ভরসা। এখন শিক্ষার্থীদের দূরে গিয়ে পড়াশো করতে হচ্ছেনা। গ্রামের ঘরে ঘরে শিক্ষিত মানুষ রয়েছে বলে জানান তিনি।

মনসুর আহমেদ নামে ইসলামপুর গ্রামের এক বৃদ্ধ বলেন, আগে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠিয়ে চিন্তায় থাকতে হতো। বিশেষ করে মেয়েরা ঠিকমতো বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা সেই দুশ্চিন্তা কাজ করত মনে। এখন আর সেই দুশ্চিন্তা নেই। আমাদের মেয়েরাও এখন ছেলেদের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

কাজী মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ মো. শফিকুর রহমান বলেন, ‘ইসলামপুর গ্রামটি এখন শিক্ষানগরী হয়ে উঠেছে। প্রতিবছর আমাদের কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে বের হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯০০, অনার্স ৪০০ থেকে ৫০০ এবং মাস্টার্স সম্পন্ন করে ১৫০ থেকে ২০০ জন শিক্ষার্থী বের হচ্ছে। খুব দ্রুত ইসলামপুর গ্রামে গ্রামে শিক্ষার হার শতভাগ হয়ে যাবে’।

বিজয়নগর উপজেলা সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল মামুন বলেন, ‘বিজয়নগর উপজেলার মধ্যে ইসলামপুর গ্রামে শিক্ষার হার ভালো। গ্রামের মানুষজন শিক্ষার ব্যাপারে এখন অনেক সচেতন। এছাড়া গ্রামের মধ্যে স্কুল-কলেজ হওয়াতে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও উচ্চ শিক্ষা নিতে পারছে’।

Related posts

Facebook Comments

Default Comments

Leave a Comment