নদীগর্ভে গ্রাম, ঠিকাদারের ব্যস্ততা চেয়ারম্যানিতে!


স্টাফ রিপোর্টার :

পেশাজীবীদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার ইতিহাস এদেশে নতুন নয়। ঠিক তেমনি পেশার দোহাই দিয়ে রাজনীতিতে নিজেকে জাহির করার লোকেরও অভাব নেই এ দেশে। পেশায় ঠিকাদার এম এ জাহের কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে মেঘনা তীরবর্তী গ্রামগুলো রক্ষায় গৃহীত প্রকল্পটির মূল ঠিকাদারও তিনি। তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে তিনি ঠিকাদারির দৃশ্যপটে অনিয়মিত একেবারেই। ঠিকাদারির কাজে অনিয়মের জেরে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে জোরেশোরে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবার কথা অথচ এখনো পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে কেবলমাত্র ১৩ ভাগ। আর তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের এমন চিত্র আপনাকে আশাহত করবে নিঃসন্দেহে।

উল্লেখ্য, নবীনগর উপজেলার পাশ দিয়ে প্রবাহমান মেঘনা নদীর প্রবল ভাঙন কয়েক দশক ধরেই চলছে। প্রায় প্রতিবছর অজস্র কৃষিজমি ও ঘর-বাড়ি তলিয়ে যাচ্ছে মেঘনার বুকে। স্থানীয় নুরজাহানপুর, চিত্রি, চরলাপাং, সোনাবালুয়া, বড়িকান্দি, কেদারখোলা, ধরাভাঙ্গা, মানিকনগর সহ আরো অনেক গ্রামের ঘর-বাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গ্রামের মানুষের অনেকে নিঃস্ব হয়ে শহরে পাড়ি জমিয়েছেন জীবিকার খোঁজে। বড়িকান্দি গ্রামের নিপা বেগম জানান, তার স্বামী মনির মিয়া মাটি কাটার শ্রমিক। তাদের বাড়িটি গত এক মাস আগে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন অন্যের বাড়িতে থাকছেন। বানেসা বেগম নামের আরেক গ্রামবাসী জানান, নদীভাঙন নিয়ে সার্বক্ষণিক আতঙ্কে থাকেন। ভাঙন অব্যাহত থাকলে কিছুদিনের মধ্যে তার ঘরটিও বিলীন হয়ে যাবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলমান যে প্রকল্পটি নিয়ে এতো আলোচনা তার মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেলেও কাজ এগিয়েছে কচ্ছপগতিতে। ১ লাখ ৯১ হাজার ১৮টি ব্লক ফেলার কথা থাকলেও একটি ব্লকও ফেলা হয়নি। আবার ১ লাখ ৪৪ হাজার ২৩২ টি জিও ব্যাগের মধ্যে জিও ব্যাগ পড়েছে মোটে ১৮ হাজার। প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি দেখলে আপনার চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। যেখানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শতভাগ কাজ শেষ হয়ে যাবার কথা সেখানে এর হার মাত্র ১৩ শতাংশ। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা ১৫ মাস পেড়িয়ে যাওয়ায় বেজায় চটেছেন জনসাধারণ। তার উপর ঠিকাদারের অনুপস্থিতি ও কাজে গাফিলতির ফলে নদীভাঙনের জেরে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে বসেছে একের পর এক গ্রাম । ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলেছেন এমন গ্রামবাসীদের এক মতবিনিময় সভায় এসে নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ঝেড়ে গেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য এবাদুল করিম বুলবুল।

স্থানীয় বড়িকান্দি ইউনিয়নের সোনাবালুয়া,মুক্তারামপুর, ধরাভাঙ্গা, বড়িকান্দি,নূরজাহানপুর, গ্রামে মেঘনার তীব্র ভাঙ্গনের মুখে গত বছরের মার্চে ৭১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। বড়িকান্দি লঞ্চ ঘাট থেকে এমপি বাধ পর্যন্ত মোট ২৭’শ মিটার ভাঙ্গনরোধ কাজের মধ্যে ৪৯ কোটি টাকায় ১৯’শ মিটারের কাজ করার চুক্তি হয় যৌথ ভাবে ‘তমা কনষ্ট্রাকশন’ এবং এম এ জাহেরের সাথে। ৩টি প্যাকেজের এই কাজের মধ্যে প্রথম প্যাকেজে ৫৭ হাজার ৬৯২ টি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ সম্পন্ন হলেও ৭৬ হাজার ৫’শটি ব্লকের মধ্যে মাত্র ৬ হাজার ব্লক ফেলা হয়েছে। ২য় প্যাকেজে ধরা ৭২ হাজার ১১৬টি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ সম্পন্ন হলেও ৯৫ হাজার ৫০৯টি ব্লকের মধ্যে ফেলা হয়েছে ১২ হাজার ব্লক। আর তৃতীয় প্যাকেজে কোন কাজই এখনো হয়নি। এরমধ্যেই আবার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে সোনাবালুয়া গ্রাম। বর্তমানে ভাঙ্গন নূরজাহানপুর গ্রামকে গ্রাস করে চলেছে। এমতাবস্থায় উদ্বিগ্ন গ্রামবাসী সম্প্রতি ভাঙ্গন এলাকা নূরজাহানপুরে সভা করেছেন। সেখানে ক্ষোভ প্রকাশ করেন খোদ সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে এলাকার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা।

গ্রামটির বাসিন্দা জনশক্তি রপ্তানি ব্যুরোর সাবেক মহাপরিচালক মাহবুবুর রহমান বলেন, কাজের উদ্ধোধনের সময় ঠিকাদার স্বপ্রণোদিত হয়েই বলেছিলেন ১৮ মাস প্রকল্পের মেয়াদ। আমি ৯ মাসেই এই কাজ শেষ করবো। কিন্তু ৯ মাসের পর ১৮ মাস পেরিয়েছে। কাজ আর হয়নি। তারও (ঠিকাদার) আর দেখা নেই। প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়ন না হওয়া অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় বলে অভিমত তার।

স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. এবাদুল করিম বুলবুল বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদারের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ার ঘটনায় আমি খুবই হতাশ। কোনো দিকেই কোন সমস্যা নেই। শুধু ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে কাজ না হওয়া খুবই হতাশাজনক। এ নিয়ে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে মামলা করার সুযোগ থাকলে গ্রামবাসীদের তা করার পরামর্শ দেন তিনি।

সাংসদ আরো বলেন, এমনতো নয় যে, কাজ বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে, প্রাধান্য দিচ্ছে না। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙ্গন রোধে ৬৯০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন জানিয়ে সংসদ সদস্য বলেন,এজন্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালকসহ পুরো টিম দু’বার এসেছেন এখানে। মন্ত্রী এসেছেন। কিন্তু প্রকল্প এনে লাভ কি হবে, যদি ঠিকাদার সবাইকে জিম্মি করে রাখেন। এটা আমার জন্যে একটি বিরাট শিক্ষা। আমি খুবই মর্মাহত।

সভায় উপস্থিত পানি উন্নয়ন বোর্ডের কুমিল্লা অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী জহির উদ্দিন আহমেদ ঠিকাদারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সর্বাত্মক আশ্বাস দেন। এদিকে সভায় ঠিকাদারকে হাজির থাকতে বলা হলেও সেখানে না এসে নিজের লোকজনদের সংসদ সদস্যের বাড়িতে পাঠান। সে সময় সংসদ সদস্যের কাছে কাজ করতে না পারার নানা অজুহাত দাঁড় করান তারা।

ঠিকাদার এম এ জাহেরের অংশীদার আবুল কাশেম বলেন- ষ্টিমেট পুরানো হওয়ায় ডিপার্টমেন্ট থেকেই তাদের কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়। তাছাড়া টাস্কফোর্স নিয়মিত না আসার কারণে তারা কাজ করতে পারেননি বলেও জানান তিনি।

Related posts

Facebook Comments

Default Comments

Leave a Comment