খনন শেষ হয়নি, ধ্বসে পড়ছে খালের দুই পাড়ের মাটি



স্টাফ রিপোর্টার :

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বড়াইল বাজার খালের ১৩০০ মিটার অংশ পুনঃখননে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। খালের তলদেশ খনন না করে শুধু পাড়ের মাটি কেটে প্রস্থ বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন খালপাড়ের বাসিন্দারা। সেই মাটি আবার খালের পাড়েই ফেলার কারণে আসন্ন বর্ষায় মাটি ধ্বসে ফের খালে পড়বে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

ক্ষোভের সঙ্গে স্থানীয়রা বলেন, এভাবে খাল খননের ফলে দুই পাড়ের বাসিন্দাসহ এলাকাবাসীর কোনো লাভ হবে না বরং উল্টো ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

বড়াইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন বলেন, দেশের ৬৪টি জেলায় ছোট নদী, খাল এবং জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পের (প্রথম পর্যায়) আওতায় এই খাল খনন করতে প্রায় ২৭ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। বড়াইল, খারঘর ও জালশুকা– এই তিনটি গ্রামের প্রায় ৩০ একর কৃষি জমিতে পানি সেচ এবং খরা মৌসুমে খালে পানি সংরক্ষণের জন্য এই খালটি পুন:খনন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল। কিন্তু খাল খননের দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ময়মনসিংহের ‘এম এস এম রহমান এন্টারপ্রাইজ’ নিজেরা কাজ না করে কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার আল-আমিন নামের এক ঠিকাদারের সঙ্গে এটি খননের ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ হন। এরপর ভৈরবের ঠিকাদারও নিজেরা কাজ না করে স্থানীয় খারঘর গ্রামের ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমানকে খাল খননের দায়িত্ব দেন। এভাবে হাত বদলের পর মুজিবুরের নেতৃত্বে দায়সারাভাবে খনন কাজ করে নদীর পানি খালে ছেড়ে দেওয়ায় স্থানীয় লোকজনের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সংশ্লিষ্টদের নির্লিপ্ততা ও খামখেয়ালির কারণে খননকাজ ত্রুটিপূর্ণ হয়েছে উল্লেখ করে ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, সরকারের এই টাকা যে জলে যাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। খনন কাজে এমন অনিয়মের ফলে সরকারের এ মহতি উদ্যোগের সফলতা থেকে জনগণ বঞ্চিত হবে বলে মনে করেন তিনি।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, খালটি খননের ক্ষেত্রে নিয়মের ধার-ধারেনি ব্যবসায়ি ‍মুজিবুর সিন্ডিকেট। পাউবোর লোকজন সঠিক সময়ে খনন কাজও তদারকি করেনি। বড় আকারের ভেকু মেশিনের সাহায্যে খনন করার কথা থাকেলেও ছোট মেশিনে খনন করা মাটি উত্তোলন করে দূরে না ফেলে পাড়েই রেখে দেওয়ায় সামান্য বৃষ্টি হতে না হতেই কিছু কিছু অংশের মাটি ধসে গেছে।

গত ২৭ মে বৃহস্পতিবার খাল পুনঃখনন কাজ পরিদর্শন করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাসসহ অন্য দুজন প্রকৌশলী। রঞ্জন কুমার দাস বলেন, স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে সার্ভে করা হয়। খাল খনন প্রকল্পের শিডিউলে ২০০০ ঘনমিটার মাটি কাটার কথা উল্লেখ আছে, কিন্তু সার্ভেতে ১৬০০ ঘনমিটার পাওয়া গেছে। মাটি কম কাটার বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো।

এদিকে এলাকাবাসীর এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরেজমিন বড়াইল ও খারঘর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, খালের খনন করা মাটি দূরে না সরিয়ে তা পাড়েই রাখা হয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হতে না হতেই বেশ কিছু অংশের মাটি ইতোমধ্যে ধসে গেছে।

এ সময় বড়াইল গ্রামের কৃষক তাজুল ইসলাম বলেন, ‘যারা কাম করছে তারা কইছিল পরে পাড়ের মাডি দূরে সরাইয়া খাল আরো গভীর কইরা দিবে। কিন্তু তারা এইডা না কইরা নদীর পানি হালে (খাল) ছাইড়া দিছে।

অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে খনন কাজ করা মুজিবুর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, খাল খনন এর ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম করা হয়নি। এলাকার একটি কুচক্রী মহল আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।‌‌

উল্লেখ্য, অত্যন্ত প্রাচীন এই বড়াইল বাজার মূলত নৌপথ নির্ভর ঐতিহ্যবাহী একটি বাজার। সপ্তায় দুই দিন–রোববার ও বৃহস্পতিবার– হাট বসে এখানে। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে নবীনগরের বড়াইল ইউনিয়নের খারঘর, জালশুকা, গোসাইপুর, মেড়াতলি ও কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের গৌরনগর, সাতঘরহাটি এবং পার্শ্ববর্তী সদর উপজেলার সাদেকপুর ইউনিয়নের বিরামপুর, চিলোকুট, আলাকপুর, দামচাইল ও নাটাই উত্তর ইউনিয়নের নরসিংসার, গাছতলা ও আদমপুর এবং আশুগঞ্জ উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের তারুয়া ও খোলাপাড়া এবং লালপুর ইউনিয়নের লালপুর ও বায়েকসহ আশপাশের আরো কয়েকটি গ্রামের লোকজন তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য নিয়ে এই বাজারে আসেন। নবীনগরের কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের যোগাযোগ বঞ্চিত গ্রাম গৌরনগরের বাসিন্দারা বছরের আট মাস সবজির চাষ করে থাকেন। তারা নৌপথ ব্যবহার করে একমাত্র বড়াইল বাজারেই তাদের পণ্য বিক্রি করে থাকেন।

Related posts

Facebook Comments

Default Comments

Leave a Comment